আইসিটি ব্যবহারে নৈতিকতা ও সাইবার অপরাধ
নৈতিকতা ও কম্পিউটার এথিকস
নৈতিক মূল্যবোধ হলো কিছু নির্দিষ্ট নৈতিক ধারণা, যা মানুষ নিজের ভেতর ধারণ করে, আর যা অনেকটা তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দিয়ে প্রভাবিত হয়। আইসিটির যুগে প্রায় সব কাজেই কম্পিউটার জড়িত, তাই নৈতিকতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ কারণে ব্যবহারিক দর্শনশাস্ত্রের একটি শাখা তৈরি হয়েছে, যার নাম কম্পিউটার এথিকস বা কম্পিউটার নীতিশাস্ত্র। পেশাগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে কম্পিউটিং পেশাজীবীরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, তা নিয়ে এটি আলোচনা করে।
বোলিং গ্রিন স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. ওয়াল্টার ম্যানার সর্বপ্রথম "কম্পিউটার এথিকস" টার্মটি পরিচিত করান।
ইন্টারনেটের উত্থানে কিছু নতুন নৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে:
- হ্যাকিং কি নৈতিক?
- অন্যের তথ্য পাওয়ার এত উপায় আছে; ব্যক্তিগত ডেটা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে ("ইনফরমেশন স্টোরেজ অ্যান্ড রিট্রিভাল")?
- টরেন্ট সাইট থেকে সফটওয়্যার, মিউজিক বা মুভি বিনামূল্যে কপি করা কি উচিত?
- ইন্টারনেট এখন ভায়োলেন্স, শিশু পর্নোগ্রাফি আর অন্যকে সমস্যায় ফেলার হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
কম্পিউটার এথিকসের দশটি নির্দেশনা
📌 ১৯৯২ সালে "কম্পিউটার এথিকস ইনস্টিটিউট" কম্পিউটার এথিকস বিষয়ে দশটি নির্দেশনা তৈরি করে। র্যামন সি. বারকুইন তাঁর "In Pursuit of a 'Ten Commandments' for Computer Ethics" গবেষণাপত্রে এগুলো উপস্থাপন করেন।
- অন্যের ক্ষতি করতে কম্পিউটার ব্যবহার করো না।
- অন্যের কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করো না।
- অন্যের কম্পিউটারের ডেটায় নজরদারি করো না।
- তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে কম্পিউটার ব্যবহার করো না।
- মিথ্যা তথ্য রটানোর কাজে কম্পিউটার ব্যবহার করো না, সহযোগিতাও করো না।
- যে সফটওয়্যারের দাম দাওনি, তা ব্যবহার বা কপি করো না।
- অনুমতি ছাড়া অন্যের কম্পিউটারের রিসোর্স ব্যবহার করো না।
- অন্যের বুদ্ধিদীপ্ত বা গবেষণার ফলকে নিজের বলে দাবি করো না।
- প্রোগ্রাম লেখার আগে সমাজে তার প্রভাব কী হবে, ভেবে দেখো।
- যোগাযোগে সহকর্মী ও অন্য ব্যবহারকারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সৌজন্য দেখাও।
কম্পিউটার ক্রাইম (Computer Crime)
হ্যাকিং (Hacking)
📌 প্রোগ্রাম রচনা ও প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো কম্পিউটার সিস্টেম বা নেটওয়ার্কের ক্ষতিসাধন করাকে হ্যাকিং বলা হয়।
যারা এ কাজ করে, তাদের হ্যাকার বলে। 📌 "হ্যাকিং নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ড", কারণ হ্যাকাররা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ভেঙে তথ্য আর অর্থ চুরি করে। 📌 কখনো কখনো হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ভাইরাস বা ম্যালওয়্যার প্রোগ্রাম ঢুকিয়ে নেটওয়ার্ক বা তথ্য ব্যবস্থা ধ্বংস বা ক্ষতিসাধন করা হয়, যা সুস্পষ্টভাবে আইনবিরুদ্ধ কাজ। আইনের চোখে এরা সাইবার ক্রিমিনাল।
📌 বর্তমানে প্রধানত তিন ধরনের হ্যাকার দেখা যায়:
| ধরন | কাজ |
|---|---|
| হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার | সাধারণত সিস্টেমের ক্ষতি করে না, তবে কাজে ভীষণ দক্ষ |
| ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকার | ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, আর্থিক তথ্য হাতিয়ে আর্থিক ক্ষতি করে |
| গ্রে হ্যাট হ্যাকার | নেটওয়ার্কের দুর্বলতা খুঁজে কর্তৃপক্ষকে জানায় আর ঠিক করে দিয়ে অর্থ উপার্জন করে |
ফ্রেকিং (Phreaking)
ফ্রেকিং বা Phreaking শব্দটি এসেছে Phone আর Freak শব্দ মিলে। 📌 বিভিন্ন টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম হ্যাক করে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে ফ্রেকিং বলা হয়। কম্পিউটার প্রচলনের আগে হ্যাকাররা টেলিফোনেই হ্যাকিং করত। 📌 সাধারণভাবে ফোন হ্যাকারদের Phreaker নামে ডাকা হয়।
স্পুফিং ও স্নিফিং (Spoofing and Sniffing)
- স্পুফিং: ভুয়া ওয়েবসাইট দিয়ে আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার কৌশল। স্পুফড সাইট আসল সাইটের প্রায় হুবহু নকল (মিরর ইমেজ), তাই ব্যবহারকারী বুঝতে না পেরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে ফেলেন।
- স্নিফিং: ট্রান্সমিশন লাইন দিয়ে তথ্য যাওয়ার সময় তা তুলে নেওয়া; সাধারণত তার বা তারবিহীন ব্যবস্থাতেই হয়। 📌 স্নিফিং শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। তাই এর বিরুদ্ধে সুরক্ষার একমাত্র পথ ডেটা এনক্রিপশন।
ডিনায়াল অব সার্ভিস অ্যাটাক (Denial of Service Attacks)
এমন উদ্যোগ, যাতে কোনো কম্পিউটার বা নেটওয়ার্ক রিসোর্সকে বৈধ ব্যবহারকারীর কাছে দুষ্প্রাপ্য করে তোলা হয়। এতে ই-মেইল, ওয়েবসাইট, অনলাইন অ্যাকাউন্ট (ব্যাংকিং) বা অন্য সেবায় ঢোকা যায় না।
স্প্যামিং (Spamming)
📌 অনাকাঙ্ক্ষিত বার্তা ব্যাপকভাবে পাঠাতে ইলেকট্রনিক মেসেজিং সিস্টেমের ব্যবহার হলো স্প্যাম বা স্প্যামিং। এর মাধ্যমে একাধিক মেইলিং লিস্ট, ব্যক্তি বা নিউজগ্রুপে অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজ পাঠানো হয়।
এগুলো প্রায় সবসময় বাণিজ্যিক; একে জাঙ্ক মেইল-ও বলে। বিজ্ঞাপনের আড়ালে আইডেন্টিটি থেফট বা অন্য জালিয়াতির উদ্দেশ্যেও পাঠানো হয়।
সাইবার আক্রমণ বা সাইবার ওয়ারফেয়ার (Cyber-attack)
কোনো কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার চেষ্টা, যাতে অনুমতি ছাড়াই অন্যের সব গতিবিধি ট্র্যাক করা যায়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যেমন সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালায়, তেমনি কিছু দেশ ও গোষ্ঠী ইন্টারনেটে সাইবার সন্ত্রাস চালায়।
সাইবার থেফট (Cybertheft)
অসৎ বা অবৈধ উদ্দেশ্যে কম্পিউটার ব্যবহার করে ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত তথ্য চুরি। এটি দুই ধরনের: ডেটা থেফট (Data Theft) আর আইডেন্টিটি থেফট (Identity Theft)।
ক্ষতিকর সফটওয়্যার: ভাইরাস, ওয়ার্ম, ট্রোজান হর্স আর স্পাইওয়্যার
কম্পিউটার ভাইরাস একটি ক্ষতিকর প্রোগ্রাম। ব্যবহারকারীর অজান্তে মেমোরিতে ঢুকে গোপনে ছড়িয়ে পড়ে মূল্যবান প্রোগ্রাম আর তথ্য নষ্ট করে; অনেক সময় কম্পিউটারকে অচলও করে দেয়।
সফটওয়্যার পাইরেসি (Software Piracy)
📌 সফটওয়্যার পাইরেসি বলতে প্রস্তুতকারীর অনুমতি ছাড়া কোনো সফটওয়্যার কপি, বিতরণ বা আংশিক পরিবর্তন করে নিজের নামে চালিয়ে দেওয়াকে বোঝায়। 📌 অন্যের জিনিস চুরির মতোই সফটওয়্যার পাইরেসিও একটি অপরাধ।
এতে সফটওয়্যার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হার্ডওয়্যার চুরি ও ডেটা চুরি
- হার্ডওয়্যার চুরি (Hardware Theft): মাইক্রোকম্পিউটারের যন্ত্রাংশ মূল্যবান, কিন্তু সহজে বহনযোগ্য, তাই চুরি বেশি হয়। একটি ব্রিফকেসেই ল্যাপটপ সরানো যায়, আর তার সাথে হার্ডডিস্কের মূল্যবান ডেটাও হাতছাড়া হয়।
- ডেটা চুরি (Data Theft): সরকারি বা ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ ডেটা চুরি হলে প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই ডেটা চুরি ঠেকানো খুবই জরুরি।
প্লেজিয়ারিজম (Plagiarism)
📌 যেকোনো উৎস থেকে লেখা সংযোজন করলে তাতে মূল লেখক বা মূল কর্মের স্রষ্টার নাম অবশ্যই উল্লেখ করা উচিত। এটিই বিধান। এর ব্যতিক্রম হলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের অপরাধই হলো প্লেজিয়ারিজম (Plagiarism)।
তথ্য প্রযুক্তির যুগে ধ্যান-ধারণা, গবেষণা, কৌশল, প্রোগ্রামিং কোড, গ্রাফিক্স, লেখা, ছবি, গান ইত্যাদির উৎস উল্লেখ না করে নিজের নামে চালানো বেড়েছে, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
ইন্টারনেটে অনেক তথ্য উন্মুক্ত থাকলেও তা ব্যবহারের নিয়ম আছে। যেমন: ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্স (CCL)-এর তথ্য বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, তবে উৎস উল্লেখ করতেই হবে। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়াও এই লাইসেন্সে চলে। আইডিয়া, গবেষণাপত্র বা নোট উৎস ছাড়া কপি করা প্লেজিয়ারিজম; এতে মৌলিক গবেষণা নিরুৎসাহিত হয়, আর ব্যক্তিগত ক্রিয়েটিভিটি বা মেধা দুর্বল হয়।
ফিশিং ও ভিশিং (Phishing and Vishing)
- ফিশিং: টোপ দিয়ে মাছ ধরার মতো, বিশ্বস্ত দেখতে ভুয়া সাইটে নিয়ে গিয়ে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য যাচাইয়ের নামে চাওয়া হয়। ফাঁদে পা দিলে হ্যাকার সব তথ্য হাতিয়ে সর্বস্বান্ত করে ছাড়ে।
- ভিশিং: টেলিফোন বা অডিও ব্যবহার করে ফিশিং করাকে বলে অডিও ফিশিং বা ভিশিং। যেমন: ফোনে লটারি জেতার খবর দিয়ে টাকা তোলার জন্য ব্যাংক ভেরিফিকেশনের তথ্য চাওয়া।
বোর্ড বই: পৃষ্ঠা ৬৫–৬৭ (অধ্যায় ১: আইসিটি ব্যবহারে নৈতিকতা, কম্পিউটার ক্রাইম)