বিশ্বগ্রাম: চিকিৎসা, গবেষণা, অফিস, বাসস্থান
বিশ্বগ্রামের পরের চারটি ক্ষেত্র: চিকিৎসা, গবেষণা, অফিস আর বাসস্থান।
১. চিকিৎসা (Health care and treatment)
কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের সাহায্যে এখন অনলাইন থেকেও চিকিৎসা নেওয়া যায়। অনলাইন ডেটাবেজে রোগীর ইতিহাস (History), প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট আর অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র সংরক্ষিত থাকে, যেখান থেকে পরামর্শ নেওয়া যায়।
📌 ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একজন ডাক্তার একই সময়ে এক দেশে বসে অন্য দেশের রোগীর চিকিৎসা করতে পারেন।
📌 চিকিৎসা সেবাকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে ইন্টারনেট বিরাট ভূমিকা রাখছে।
দেশের মোবাইল অপারেটররাও এখন টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে।
টেলিমেডিসিন (Telemedicine)
📌 দূরে থেকেও টেলিফোন আর ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়াই হলো টেলিমেডিসিন।
অর্থাৎ রোগীকে সামনাসামনি না দেখেও তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা। রোগী সশরীরে না এসে ভিডিও কনফারেন্সে ডাক্তার দেখান, আর রিপোর্ট ও ব্যবস্থাপত্র ই-মেইলে আদান-প্রদান হয়।
রোগীর সব তথ্য EHR (Electronic Health Record) ডেটাবেজে রাখা হয়, ফলে রোগী যেকোনো জায়গা থেকে নিজের রিপোর্ট আর ব্যবস্থাপত্র দেখতে পারেন। টেলিমেডিসিনে ব্যবহৃত কিছু সফটওয়্যার: MediTouch, Jareoc, TheraNest।
টেলিমেডিসিনের সুবিধা:
- হাসপাতালে না গিয়ে ঘরে বসেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা
- কম খরচে দ্রুত চিকিৎসা
- এক ডাক্তার অন্য অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন
- বিদেশে না গিয়েও বিদেশি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
- সহজে রোগ বিশ্লেষণ আর রোগীর সব তথ্য সংরক্ষণ
টেলিমেডিসিন: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
বাংলাদেশে টেলিমেডিসিন এখনো নতুন। সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা খোলা মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছে, যেখানে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সবসময় থাকেন; দিনে-রাতে যেকোনো সময় ফোন করে পরামর্শ নেওয়া যায়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও ধীরে ধীরে এ সেবা চালু হচ্ছে।
দেশের প্রথম টেলিমেডিসিন সেবাকেন্দ্র চালু হয় যশোরের ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রে (ইউআইএসসি)। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ১০০ টাকা ফি দিয়ে রাজধানীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সাথে স্কাইপিতে কথা বলার সুযোগ পান।
📌 দেশের ২২টি ইউনিয়নের তথ্য ও সেবা কেন্দ্রে স্কাইপি ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবহার করে টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগে বসে চিকিৎসকেরা প্রতি কর্মদিবসে বিনামূল্যে এ সেবা দিচ্ছেন।
ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড (EHR): কোনো জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্য নির্দিষ্ট উপায়ে সংগ্রহ করে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড বলে। একে EMR (Electronic Medical Report) বা CPR (Computerized Patient Report)-ও বলে। বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিকের ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, যাতে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো নাগরিকের স্বাস্থ্যের তথ্য জানা যায় আর কম খরচে চিকিৎসা নিশ্চিত হয়।
২. গবেষণা (Research)
গবেষণা ছাড়া কোনো দেশ এগোতে পারে না। এখন বড় গবেষণা প্রকল্পে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষক একসাথে কাজ করেন, কারণ:
- বিশাল খরচ একা কোনো দেশের পক্ষে বহন করা কঠিন; ভাগাভাগি করলে খরচ কমে
- বিভিন্ন দেশের গবেষকের জ্ঞান মিললে ফল বেশি ভালো হয়
- সব দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার নেই; একসাথে কাজ করলে এক দেশের গবেষক অন্য দেশের গবেষণাগার ব্যবহার করতে পারেন
আইসিটির কারণে গবেষণার ফলাফল ব্লগ আর ওয়েবসাইটে শেয়ার করা যায়, ফলে গরিব দেশের গবেষকেরাও উন্নত দেশের গবেষণার সুফল পান। উদাহরণ: বায়োকেমিস্ট্রির পুরস্কারজয়ী ব্লগ BU Research Blog। আবার go-lab-project.edu, olabs.edu.in-এর মতো ভার্চুয়াল ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে যেকোনো জায়গা থেকে বিজ্ঞানের পরীক্ষা করা যায়।
📌 গবেষণায় তথ্য প্রযুক্তির একটি অনন্য অবদান হলো ওয়েবভিত্তিক, বহুভাষিক, মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া (Wikipedia)।
📌 "উইকি" হাওয়াইয়ান ভাষার শব্দ, যার অর্থ "ছোটো ছোটো পায়ে হাঁটা"। সারা বিশ্বের মানুষের ছোট ছোট অবদানে উইকিপিডিয়া আজ বিশাল জ্ঞানভান্ডার, তাই এই নাম।
উইকিপিডিয়া সম্পর্কে:
- প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস ও ল্যারি স্যাঙ্গার, ২০০১ সালের ১৫ জানুয়ারি
- এখন পরিচালনা করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন
- নিবন্ধন করে যে কেউ নিয়ম মেনে নিবন্ধ যোগ করতে পারে; প্রায় তিন কোটির মতো নিবন্ধ আছে
- সবচেয়ে বড় সমালোচনা: এখানকার তথ্যের বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন আছে
৩. অফিস (Office)
এখন অফিসে আধুনিক যন্ত্রপাতি আর সফটওয়্যার ব্যবহার হয়। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অফিসগুলোর কাজের সমন্বয়ে অনলাইনভিত্তিক বা ওয়েবভিত্তিক অফিস ব্যবস্থাপনা চালু হয়েছে; বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ওয়েবপেজ আছে।
আউটসোর্সিংয়ে বায়ার পূর্ণকালীন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছেন, আর কর্মী বাড়িতে বসে অফিস টাইমের মতো পুরো সময় কাজ করছেন। বিশেষ সফটওয়্যার কর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বায়ার বাংলাদেশি কর্মীকে ভাড়া করতে পারছেন; বাড়িই হয়ে উঠছে ভার্চুয়াল অফিস, আর বায়ারকে আলাদা অফিস ভাড়া করতে হচ্ছে না।
পেপারবিহীন অফিস: অফিসের সব কাজে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাগজের ব্যবহার ছাড়াই চলা অফিস।
📌 এ ধরনের অফিসে ফাইল আর তথ্য রাখার জন্য ক্লাউড সার্ভিস ব্যবহার করা হয়। যেমন ড্রপবক্স আর গুগল ড্রাইভ।
এতে অফিসের তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের হাতে যায় না, আর অগ্নিকাণ্ড বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কাগজপত্র নষ্ট হওয়ার ভয়ও থাকে না।
📌 অফিস পরিচালনায় তথ্য প্রযুক্তির আরেকটি ব্যবহারিক টুল হলো অফিস অটোমেশন সিস্টেম।
অফিস অটোমেশন: এমন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা, যেখানে কম্পিউটার, নেটওয়ার্কিংসহ বিভিন্ন ডিভাইস দিয়ে অফিসের সব কাগজের কাজ আর যোগাযোগ পরিচালনা করা হয়।
📌 অফিস অটোমেশনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার: মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, ওপেন অফিস অর্গ, অ্যাক্রোবেট রিডার।
অফিসের ডিভাইস: কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ফ্যাক্স, স্ক্যানার, প্রিন্টার, ফটোকপিয়ার, প্রজেক্টর, সিসিটিভি, আইপি, পিএবিএক্স, আর কর্মীদের হাজিরার জন্য বায়োমেট্রিক্স ডিভাইস।
📌 ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা এমন অফিসকে বলে ভার্চুয়াল অফিস, আর এদের সেবাকে বলে 24/7 সার্ভিস।
৪. বাসস্থান (Residence)
আগে বাসস্থান মানে ছিল যেখানে মানুষ থাকে। এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে মানুষ এক দেশে বসে অন্য দেশে ভার্চুয়ালি "বিচরণ" করতে পারে। যেমন চীনে বসে কেউ কানাডার আত্মীয়ের সাথে ভিডিও চ্যাট করছেন, যেন তিনি কানাডার সেই বাড়িতেই আছেন। সবাই হয়ে উঠছে ইন্টারনেটের নাগরিক বা নেটিজেন।
স্মার্ট হোম
📌 স্মার্ট হোম এমন একটি বাসস্থান, যেখানে রিমোট কন্ট্রোলিং বা প্রোগ্রামিং ডিভাইসের সাহায্যে বাড়ির হিটিং, কুলিং, লাইটিং আর সিকিউরিটি কন্ট্রোল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
টেলিভিশন, এসি, লাইট, ফ্যান, সিকিউরিটি ক্যামেরার মতো ডিভাইস মোবাইল বা রিমোট দিয়ে এক জায়গা থেকে চালানো যায়। চীন, সিঙ্গাপুর, কোরিয়ার মতো দেশে গ্লোবাল রেসিডেন্স গড়ে উঠছে, যেখানে Wi-Fi, ক্যাবল টিভি, ইন্টারকম, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ব্যায়ামাগার, কমিউনিটি সেন্টার, লন্ড্রি, স্বাস্থ্যসেবাসহ সব সুবিধা থাকে।
📌 বাসস্থানের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে আইপি ক্যামেরা।
স্মার্ট হোমের সুবিধা:
- ঘরে বসে অফিসের কাজ, কনফারেন্স আর ডেটা আদান-প্রদান; সময় ও খরচ বাঁচে
- রিমোটে গাড়ির গ্যারেজ, দরজা-জানালা খোলা
- বাইরে থাকার সময় কেউ এলে সিকিউরিটি অ্যালার্মে মোবাইলে খবর পাওয়া
- রোবট দিয়ে চা বানানো, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার
- ঘরে বসে ইন্টারনেটে ডাক্তারের পরামর্শ
- ট্র্যাকিং ও সেন্সিং প্রযুক্তিতে চাবি, মানিব্যাগের মতো জিনিস খুঁজে পাওয়া
- বিছানায় শুয়েই রিমোটে টিভি, এসি, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, ফ্যান, লাইট চালানো
- বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সমস্যা বা আগুন লাগলে ডিটেক্টর অ্যালার্ম দেয় আর মূল লাইন বন্ধ করে দেয়
- চোর-ডাকাত এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশকে খবর দেয়
স্মার্ট হোম তৈরিতে প্রযুক্তি
📌 স্মার্ট হোম তৈরিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ডিজাইন, যার জন্য জনপ্রিয় CAD (Computer Aided Design) সফটওয়্যার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
www.homestyler.com একটি ফ্রি অনলাইন সফটওয়্যার, যা দিয়ে বিনামূল্যে স্মার্ট হোমের ডিজাইন করা যায়। বাসার যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের কিছু সফটওয়্যার: HomeSeer, Contron, Vera, Staples Connect, Iris, Savant, SmartThings, Wink, Nexia।
ইন্টারনেট অব থিংস (Internet of Things – IoT)
📌 বিভিন্ন জিনিসপত্রের সাথে ইন্টারনেটের সংযোগকে ইন্টারনেট অব থিংস, সংক্ষেপে আইওটি বলা হয়।
এসি, কফিমেকার, টেম্পারেচার কন্ট্রোল, ফ্যান, টিভি, দরজার ইলেকট্রিক লক, গাড়ির গ্যারেজের দরজা, সবকিছুই ইন্টারনেটে যুক্ত করে পৃথিবীর যেকোনো জায়গা থেকে মুঠোফোনে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আইওটি দিয়ে এমন স্মার্ট ল্যাম্প বা কফিমেকার বানানো যায়, যা নিজেই সময়মতো চালু-বন্ধ হবে, অথবা স্মার্টফোন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কারো অনুপস্থিতিতে কেউ বাসায় ঢুকলে টেক্সটে খবর পৌঁছাবে। ধারণা করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ২০০ বিলিয়ন ডিভাইস আইওটিতে যুক্ত হবে।
বোর্ড বই: পৃষ্ঠা ১৯–২৩ (অধ্যায় ১: বিশ্বগ্রাম: চিকিৎসা, গবেষণা, অফিস, বাসস্থান)