বিশ্বগ্রাম: ব্যবসা, সংবাদ, বিনোদন, সাংস্কৃতিক বিনিময়
বিশ্বগ্রামের শেষ চারটি ক্ষেত্র: ব্যবসায়-বাণিজ্য, সংবাদ, বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ আর সাংস্কৃতিক বিনিময়।
১. ব্যবসায়-বাণিজ্য (Business)
কয়েক দশক আগেও এক দেশের সাথে অন্য দেশের ব্যবসায় নানা জটিলতা ছিল। আইসিটির ছোঁয়ায় এখন ঘরে বসে ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্ডার দিয়ে ক্রেডিট কার্ডে দাম দিতে পারেন, আর নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ঘরে পৌঁছে যায়। বিশ্বজুড়ে ক্রেতারা এখন আন্তঃসংযুক্ত।
দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পণ্যের বাজার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে হবে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি কমে আর প্রযুক্তি স্থানান্তরে কলকারখানার উন্নতি হয়। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে EPZ (Export Processing Zones), যেখানে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য তৈরি হয়।
ই-কমার্স (E-Commerce)
📌 ইলেকট্রনিক কমার্সকেই সংক্ষেপে ই-কমার্স বলা হয়। ইন্টারনেট বা অন্য কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে পণ্য বা সেবা কেনাবেচাই ই-কমার্স।
পণ্য বা সেবার উৎপাদন, মার্কেটিং, ডেলিভারি, সার্ভিসিং আর অনলাইনে দাম পরিশোধ, সবই ই-কমার্সের অংশ।
ই-কমার্সের ইতিহাস:
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৬০ | 📌 ইলেকট্রনিক ডেটা ইন্টারচেঞ্জ (EDI)-এর মাধ্যমে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু |
| ১৯৭৯ | ইংল্যান্ডের মাইকেল অলড্রিচ অনলাইন শপিং পদ্ধতি আবিষ্কার করেন |
| ১৯৯০–২০০০ | ই-কমার্সের ব্যাপক বিস্তার |
| ১৯৯৫ | amazon.com আর ebay.com-এর যাত্রা |
| ২০১০-এর পর | মোবাইল আর সামাজিক মাধ্যমে (বিশেষ করে ফেসবুকে) ই-কমার্সের নতুন জোয়ার |
বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ই-কমার্সে প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কেনাবেচা হয়।
📌 ইন্টারনেটে কোনো পণ্য বা সেবা কিনলে তাকে অনলাইন শপিংও বলে।
📌 অনলাইন শপিংয়ে ক্রেতা ঘরে বসেই পণ্য পছন্দ করে কিনতে পারেন এবং ঘরে বসেই দাম পরিশোধ করতে পারেন। কোথাও যেতে হয় না, অর্থ বহনের ঝুঁকিও থাকে না।
📌 ই-কমার্সকে ব্যবসায়-বাণিজ্যের আধুনিক পদ্ধতি বলা হয়।
📌 ই-কমার্স বিশ্বগ্রামের অন্যতম সুফল। ইন্টারনেটের কারণে ঘরে বসেই বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে পণ্য কেনাবেচা করা যায়।
মোবাইল কমার্স (M-Commerce): তারবিহীন সুবিধা, অর্থাৎ মোবাইলের মাধ্যমে গ্রাহকের হাতে ই-কমার্সের সুবিধা পৌঁছানো।
📌 মোবাইল কমার্সের সেবার মধ্যে রয়েছে মোবাইলে টাকা পাঠানো বা মোবাইল মানি ট্রান্সফার, মোবাইল দিয়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা বা মোবাইল এটিএম, মোবাইলে টিকিট কাটা বা মোবাইল টিকেটিং, আর মোবাইল ব্যাংকিং।
ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (EFT): কম্পিউটারভিত্তিক ব্যবস্থায় এক বা একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মধ্যে টাকা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া।
📌 ই-কমার্সের ভিত্তিই হলো ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার সিস্টেম। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে দাম দেওয়া, ইলেকট্রনিক চেকে টাকা তোলা, ওয়েবসাইট বা ইলেকট্রনিক ব্যাংকিংয়ে টাকা স্থানান্তর, সবই EFT-এর অংশ।
বারকোড (Barcode)
📌 বারকোড হলো মেশিনে পড়া যায় এমন এক ধরনের সাংকেতিক কোড। একে সোর্স কোড-ও বলা হয়।
পণ্যের গায়ে সাদা-কালো দাগের কোডটাই বারকোড। কম্পিউটারের সাথে যুক্ত একটা ছোট যন্ত্র লাল আলো ফেলে দাগগুলো পড়ে নেয়, আর কম্পিউটারে পণ্যের নাম ও দাম চলে আসে। হিসাবে ভুল এড়াতে বারকোড ব্যবহার হয়। খালি চোখে এর অর্থ বোঝা যায় না।
কিউআর কোড (QR Code): QR মানে Quick Response। এটি এক ধরনের ম্যাট্রিক্স বা দ্বিমাত্রিক (2D) বারকোড। এতে মেসেজ, নম্বর, ওয়েবসাইটের ঠিকানা (URL), ফোন নম্বর ইত্যাদি ছবির আকারে রাখা যায়। সাদা পটভূমিতে বর্গাকার কালো বিন্দু দিয়ে তৈরি; যেকোনো ক্যামেরা দিয়ে পড়া যায়।
ই-কমার্সের সুবিধা ও অসুবিধা:
| সুবিধা | অসুবিধা |
|---|---|
| দ্রুত কেনাবেচা, সহজে পণ্য খুঁজে পাওয়া | দক্ষ লোকের অভাব |
| ব্যবসা পরিচালনার খরচ কম | উন্নত প্রযুক্তি ব্যয়বহুল |
| ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে সহজে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো | অতিরিক্ত অর্ডার সরবরাহে সমস্যা |
| পণ্যের মান উন্নয়ন | দূরের অর্ডারে কখনো খরচ বেশি |
| কম খরচে উন্নত সেবা | আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে সমস্যা |
| দোকানের সেটআপ ছাড়াই ব্যবসা; সহজে শুরু ও পরিচালনা | লেনদেনের নিরাপত্তা সমস্যা |
| ক্রেতা সশরীরে না গিয়েও পণ্য বাছাই করতে পারেন |
২. সংবাদ (News)
আগে এক দেশের ঘটনা অন্য দেশের মানুষ জানতে অনেক সময় লাগত; এখন সাথে সাথেই জানা যায়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন আর ইন্টারনেটনির্ভর অনলাইন সংবাদমাধ্যম সারাক্ষণ খবর সরবরাহ করছে। রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরার মতো চ্যানেল পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খবর তাৎক্ষণিক পৌঁছে দেয়। দেশেও www.bdnews24.com, banglanews24.com-এর মতো অনলাইন নিউজ সাইট জনপ্রিয়, আর প্রায় সব পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ আছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো চার্জের বিনিময়ে নিউজ সার্ভিস দেয়।
অনলাইন সাংবাদিকতায় রাষ্ট্রীয় নীতিমালা মানা জরুরি। বস্তুনিষ্ঠ আর নিরপেক্ষ খবর না দিলে, যেমন কারো সম্মানহানি বা রাষ্ট্রবিরোধী কিছু প্রকাশ করলে, সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এখন ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক পোর্টালেও মানুষ প্রতিনিয়ত মতামত শেয়ার করছে।
গণমাধ্যম (Mass Media): প্রযুক্তির মাধ্যমে গণযোগাযোগের সব মাধ্যম। বৈদ্যুতিক যন্ত্রে তথ্য পাঠায় বলে এগুলোকে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সম্প্রচার মাধ্যম-ও বলা হয়।
📌 মোবাইল বা সেল ফোন, কম্পিউটার আর ইন্টারনেটকে নতুন যুগের গণমাধ্যম বলা হয়।
বিশেষ করে ইন্টারনেট এখন স্বীকৃত গণমাধ্যম; এর মাধ্যমে ই-মেইল, ওয়েবসাইট, ব্লগিং, ইন্টারনেট টিভিতে প্রচারকাজ চলে। এ কারণে অনেক গণমাধ্যম এখন ওয়েবসাইটেও আছে।
আইপি টিভি (Internet Protocol Television – IPTV)
📌 ইন্টারনেট প্রটোকলের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত টিভি চ্যানেলগুলোকে বলে আইপিটিভি বা ওয়েব টিভি।
এর জন্য কোনো ভিডিও ট্রান্সমিটার বা নিজস্ব স্যাটেলাইট লাগে না, শুধু আইএসপির কাছ থেকে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েই টিভি স্টেশন চালানো যায়। দর্শক নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানায় গিয়ে যেকোনো কম্পিউটার থেকে চ্যানেল দেখতে পারেন। একইভাবে আছে আইপি রেডিও।
ব্লগ (Blog)
📌 ইংরেজি Blog শব্দটি এসেছে Weblog-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে। বাংলায়ও একে ব্লগ বলে।
ব্লগ হলো অনলাইনে ব্যক্তিগত দিনলিপি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক পত্রিকা।
📌 যিনি ব্লগে পোস্ট করেন তাঁকে ব্লগার বলে।
ব্লগাররা নিয়মিত কনটেন্ট আপডেট করেন, আর পাঠকেরা মন্তব্য করতে পারেন। ব্লগ এখন ফ্রিল্যান্স অনলাইন সাংবাদিকতারও একটা মাধ্যম।
📌 বোর্ড বই অনুযায়ী, আমেরিকান উদ্যোক্তা রিচার্ড ম্যাথিউ স্টলম্যান (Richard Mathew Stallman) ব্লগিং ধারণার প্রতিষ্ঠাতা, তাই তাঁকে ব্লগিংয়ের জনক বলা হয়। স্টলম্যান মূলত মুক্ত সফটওয়্যার আন্দোলনের পথিকৃৎ।
৩. বিনোদন ও সামাজিক যোগাযোগ (Entertainment and Social Communication)
ইন্টারনেট যুগে বিনোদনের জনপ্রিয় মাধ্যম অনলাইন গেমিং। স্ট্রিমিং অডিও-ভিডিও প্রযুক্তিতে টিভি ছাড়াই কম্পিউটারে টিভি দেখা যায়। ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেস, ডিগ, ইউটিউব, ফ্লিকারের মতো সামাজিক নেটওয়ার্কিং সাইট সামাজিক বলয়কে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত করেছে, যা বিশ্বগ্রাম গড়ায় জোরালো ভূমিকা রাখছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social Media): এমন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষ অন্যদের সাথে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে, আর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিকসহ যেকোনো মতামত, আইডিয়া আর কার্যকলাপ শেয়ার, আলোচনা ও বিতর্ক করে।
| মাধ্যম | তথ্য |
|---|---|
| ফেসবুক | 📌 যাত্রা শুরু ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। জনক ও মূল উদ্যোক্তা মার্ক জাকারবার্গ। ফ্রি সদস্য হয়ে বন্ধুত্ব, স্ট্যাটাস, মেসেজ, চ্যাটিং আর ছবি-ভিডিও শেয়ার করা যায়। শহরের শিক্ষিত মানুষ থেকে গ্রামের কৃষক, প্রায় সবারই অ্যাকাউন্ট আছে; সমাজে এর ইতিবাচক আর নেতিবাচক দুই প্রভাবই আছে। |
| ইউটিউব | জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং ওয়েবসাইট। 📌 প্রথম উদ্যোক্তাদের একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জাওয়াদ করিম; অন্য দুজন চ্যাড হার্লি ও স্টিভ চ্যান। জনপ্রিয়তা দেখে পরে গুগল এটি কিনে নেয়। 📌 এখন এটি গুগলের একটি স্বীকৃত ভিডিও শেয়ারিং সামাজিক মাধ্যম। |
| টুইটার | ফেসবুকের মতোই জনপ্রিয়, পশ্চিমা দেশে সবচেয়ে বেশি। উদ্যোক্তা জ্যাক ডরসি, নোয়া গ্লাস, ইভান উইলিয়ামস ও বিজ স্টোন। |
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুফল:
- পরিচিতজন, বন্ধু আর আত্মীয়দের সাথে সবসময় যুক্ত থাকা; সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মানসিক তৃপ্তি
- বাণিজ্যিক বিপণন আর প্রচারের অপরিহার্য হাতিয়ার
- যেকোনো তথ্য খুব দ্রুত বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায়
- সামাজিক অপরাধ ও অপরাধী শনাক্ত করা, প্রতিবাদ, জনসচেতনতা আর জনমত তৈরিতে ভূমিকা
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কুফল:
- এর প্রতি আসক্তিকে ডিজিটাল কোকেন বলা হয়; সময়ের অপচয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি আর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি
- ভাইরাল ইফেক্টে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া
- ব্যক্তিগত বিষয় দ্রুত ছড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্ক, শালীনতা আর গোপনীয়তা হুমকিতে পড়ে
- কম্পিউটার অপরাধ ও সাইবার সন্ত্রাস দ্রুত বিস্তার লাভ করে
৪. সাংস্কৃতিক বিনিময় (Cultural Exchange)
মানুষের সংস্কৃতি সবসময় বদলায়। পুরনো সংস্কৃতি ভেঙে নতুন সংস্কৃতি আসা স্বাভাবিক। তথ্য প্রযুক্তির কারণে শিল্প-সাহিত্যেও বড় পরিবর্তন এসেছে; প্রকাশনার কাজ এখন কম্পিউটার আর ইন্টারনেটনির্ভর। সংস্কৃতির নানা আয়োজন ইন্টারনেট, রেডিও আর টেলিভিশনে মুহূর্তেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এক দেশের মানুষ অন্য দেশের সংস্কৃতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত হচ্ছে। এই আদান-প্রদানেই সবার মধ্যে গড়ে উঠছে এক অদৃশ্য সুতোর বন্ধন, যা বিশ্বগ্রাম প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখে। একে বলে সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন।
তবে এর কুফলও আছে। বিভিন্ন জাতির হাজার বছরের নিজস্ব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য ভেঙে একক বিশ্ব সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয়, সামাজিক স্বকীয়তা নষ্ট হয়। এশিয়া, ইউরোপ বা আফ্রিকা, প্রতিটি মহাদেশেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, যা সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন অনেক সময় হুমকির মুখে ফেলে।
দলীয় কাজ: দুই ভাগে ভাগ হয়ে বিশ্বগ্রামের সুবিধা আর অসুবিধা নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা করো।
বোর্ড বই: পৃষ্ঠা ২৩–২৭ (অধ্যায় ১: বিশ্বগ্রাম: ব্যবসা, সংবাদ, বিনোদন, সাংস্কৃতিক বিনিময়)