মহাকাশ অভিযান, আইসিটি নির্ভর উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা
১. মহাকাশ অভিযান (Space Exploration)
📌 পৃথিবীর বাইরের মহাশূন্যের রহস্য জানার উদ্দেশ্যে চালানো অনুসন্ধান বা অভিযানকে মহাকাশ অভিযান বলে।
চাঁদে অবতরণ, স্পেস স্টেশন, অন্য গ্রহে মিশন পাঠানো, সব ক্ষেত্রেই আইসিটির বিশেষ ভূমিকা আছে। মহাকাশযানের গতি, গ্রহ-উপগ্রহের অবস্থান নিয়ে জটিল সব হিসাব করতে হয়। পৃথিবীতে ছোটখাটো ভুল সহজে শুধরে নেওয়া যায়, কিন্তু মহাকাশে সামান্য ভুল হিসাবও মারাত্মক হতে পারে। কম্পিউটার মিশনের পরিকল্পনা তৈরি করে আর মিশন চলাকালে সব প্যারামিটার বিশ্লেষণ করে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ দেয়।
📌 কম্পিউটার ছাড়া কার্যকরভাবে মহাকাশ আবিষ্কার প্রায় অসম্ভব।
জ্যোতির্বিদ্যার বড় আবিষ্কারগুলো এসেছে টেলিস্কোপ আর কম্পিউটারের হাত ধরেই।
📌 মহাশূন্যে বসে গবেষণার জন্য পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেস স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
নির্দিষ্ট সময় পরপর বিজ্ঞানীরা সেখানে গিয়ে দূর নক্ষত্রের ওপর গবেষণা করেন; যন্ত্র বিকল হলে বাইরে বেরিয়ে সারান। 📌 এসব কাজ তাঁরা করেন কম্পিউটার-নিয়ন্ত্রিত রোবটিক ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে। অন্য গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজতেও রোবট পাঠানো হয়।
📌 মঙ্গলে প্রাণের খোঁজে বিজ্ঞানীরা পাঠিয়েছেন "কিউরিসিটি" নামের অত্যাধুনিক রোবটসহ মহাকাশযান। এটি মঙ্গলের মাটিতে নেমে ছবি তুলে আর নানা বস্তু পরীক্ষা করে ফলাফল পৃথিবীতে পাঠাচ্ছে।
নাসা (NASA – National Aeronautics and Space Administration): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা, ১৯৫৮ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রতিষ্ঠিত। অ্যাপোলো চন্দ্রাভিযান, স্কাইল্যাব, স্পেস শাটল এর উল্লেখযোগ্য কাজ। 📌 নাসার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০১২ সালে মঙ্গলে পাঠানো "কিউরিসিটি রোভার" নামের অত্যাধুনিক রোবটিক মহাকাশযান। এটি নাসার পাঠানো চতুর্থ রোবট যান, যা পূর্ণাঙ্গ জৈব রসায়নাগার হিসেবে পরিচিত। গাড়ির আকারের এই যানে আছে বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, শক্তিশালী ক্যামেরা, আবহাওয়া কেন্দ্র, ড্রিলসহ রোবটিক হাত আর লেজার দিয়ে পাথর চূর্ণ করার প্রযুক্তি।
মহাকাশ অভিযানের গুরুত্ব:
- কৃত্রিম উপগ্রহ আর রোবটিক মহাকাশযানে সৌরজগতের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ।
- কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মুহূর্তে কণ্ঠস্বর, ছবি আর তথ্য পাঠানো।
- উপগ্রহের তথ্যে প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার পদ্ধতির উন্নয়ন।
- বায়ুমণ্ডল আর আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহ।
- দেশের নিরাপত্তায় পৃথিবী পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটের সহায়তা।
২. আইসিটিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা (ICT Dependent Production System)
আজকের শিল্প উৎপাদন প্রায় পুরোটাই আইসিটিনির্ভর: ডিজাইন, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত।
- টেলিযোগাযোগ সেবা: কাঁচামাল সরবরাহকারী থেকে ক্রেতা পর্যন্ত সমন্বয়; কারখানার ভেতরে ওয়্যারলেস যোগাযোগ।
- ইন্টারনেট: 📌 ইন্টারনেট ছাড়া শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থা অচল। একাধিক প্ল্যান্টের সমন্বয় ইন্টারনেটেই হয়।
- ক্যাড/ক্যাম: কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন (CAD) হাতে আঁকা ড্রয়িংয়ের জায়গায় কম্পিউটার গ্রাফিক্সে পণ্যের নকশা দেখায়। আর 📌 কম্পিউটার এইডেড ম্যানুফ্যাকচারিং (CAM)-এর মাধ্যমে কম্পিউটার ব্যবহার করে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইনকে ফিনিশড প্রোডাক্টে রূপান্তর করা হয়।
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন: 📌 আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রগুলোর একটি PLC, যার পূর্ণরূপ Programmable Logic Controller।
- উপাত্ত সংগ্রহ: মোটরের গতি, কম্পাঙ্ক, তাপমাত্রা, তরল ও রাসায়নিকের পরিমাণ সংগ্রহ করে কম্পিউটারে প্রক্রিয়া করা।
- পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ: কম্পিউটারে উপাত্ত যাচাই করে মান ঠিক আছে কি না দেখা; যন্ত্রপাতি ঠিকমতো চলছে কি না তদারকি।
- রোবটের ব্যবহার: কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক কাজ, যেমন গাড়ি কারখানা, খনি, ঢালাই, ভারী মাল ওঠানো-নামানো।
- ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ: বায়োমেট্রিক পদ্ধতি, অ্যালার্ম সিস্টেম, স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আর নিরাপত্তা সংস্থায় স্বয়ংক্রিয় মেসেজ।
বাংলাদেশে কৃষিতে আইসিটি বা ই-কৃষি
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ। প্রায় ৪৫০০টি ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্র আর কৃষি তথ্য সার্ভিসের কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকেরা এখন কম্পিউটার আর মোবাইল ব্যবহার করছেন। কৃষিতে তথ্য প্রযুক্তির এই ব্যবহারই ই-কৃষি। কৃষি তথ্য সার্ভিস কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যার কাজ তৃণমূলে কৃষি তথ্য পৌঁছে দেওয়া।
| উদ্যোগ | কাজ |
|---|---|
| www.ais.gov.bd | কৃষি বিষয়ক সবচেয়ে বড় বাংলা ওয়েবসাইট: কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, আবহাওয়া, বাজারদর |
| কৃষি তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র (AICC) | গ্রামে কম্পিউটার, প্রিন্টার, ক্যামেরাসহ কেন্দ্র; ভিডিও কনফারেন্সে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ |
| কমিউনিটি রেডিও | বরগুনার আমতলীতে কৃষি রেডিও (এফএম ৯৮.৮) |
| মোবাইলভিত্তিক সেবা | কৃষি তথ্য সার্ভিস, A2I আর বাংলালিংকের চুক্তিতে এসএমএসে তথ্য |
| কল সেন্টার | কৃষি, মৎস্য আর প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞের তাৎক্ষণিক সমাধান |
| ই-বুক | টেক্সট, ভিডিও, অডিওসহ মাল্টিমিডিয়া বইয়ে ফসল উৎপাদনের তথ্য |
| অনলাইন কৃষক টেলিভিশন | কৃষি তথ্য সার্ভিসের আইপি টিভি |
| কৃষি ইনফরমেশন বুথ (কিয়স্ক) | টাচ স্ক্রিনে অনলাইন-অফলাইন কৃষি তথ্য |
অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, BADC, BARI, BRRI, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর) বীজ, সার, ফসলের জাত আর বাজারের তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, ভারী শিল্প আর ইলেকট্রনিক্স শিল্পেও এখন আইসিটিনির্ভর যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।
RFID
📌 RFID-এর পূর্ণরূপ Radio Frequency Identification।
ক্রেডিট কার্ডের মতো পাতলা, ছোট একটা ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যা কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা প্রাণী শনাক্ত করতে ব্যবহার হয়। এতে থাকে একটি চিপ, একটি কয়েল আর অ্যান্টেনা। চিপ সাধারণত সর্বোচ্চ ২০০০ বাইট তথ্য রাখতে পারে। প্রাণীর দেহে সিরিঞ্জ দিয়ে ক্যাপসুল আকৃতির RFID ট্যাগ ঢোকানো যায়।
ব্যবহার:
- প্রাণীকে ট্র্যাক করা বা অবস্থান নির্ণয়
- গাছ বা কাঠের জিনিস শনাক্ত করা
- ক্রেডিট কার্ডের মতো ট্যাগ দিয়ে অফিস-বাসায় মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ
- দোকানে পণ্য চুরি রোধ (ট্যাগসহ বাইরে গেলেই অ্যালার্ম)
- শিপিং কন্টেইনার আর ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনে পরিচয় নির্দিষ্ট করা
৩. প্রতিরক্ষা (Defence)
প্রতিরক্ষা শিল্প যুদ্ধাস্ত্র আর যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরি করে; অনেক দেশ এগুলো রপ্তানিও করে।
📌 আইসিটি আর প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী আন্তঃসম্পর্ক। একটির উন্নতি অন্যটিকে এগিয়ে নেয়।
প্রতিরক্ষায় আইসিটির সুবিধা:
- অত্যন্ত কার্যকর আর দূরপাল্লার মারণাস্ত্র তৈরি।
- আশপাশ ধ্বংস না করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নির্ভুল আঘাত।
- বহুদূরের লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা।
- দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান।
- ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, রাডার, জঙ্গি বিমান ও যুদ্ধজাহাজ দক্ষভাবে পরিচালনা।
- স্থল, নৌ আর বিমানবাহিনীর মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ।
- শত্রুপক্ষের অগ্রগতি, অবস্থান আর হতাহতের তথ্য পর্যবেক্ষণ।
- গোপন খবর পাঠাতে আর মিসাইল ছুড়তে চালকবিহীন "ড্রোন" বিমান।
- স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগে প্রত্যেক সৈনিকের অবস্থান জানা আর তাৎক্ষণিক যোগাযোগ।
- দূরপাল্লার রাডার, ব্যাটলফিল্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, জিপিএস আর মিসাইল গাইড সিস্টেমের মতো সফটওয়্যার।
মনুষ্যবিহীন আকাশযান বা ড্রোন
📌 ড্রোন হলো এমন এক ধরনের উড়োজাহাজ বা বিমান, যা পাইলট ছাড়াই চলাচল করে।
এর সবচেয়ে বেশি ব্যবহার সামরিক কাজে। পাইলটের জীবনহানি বা শত্রুর হাতে বন্দি হওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই এই পাইলটবিহীন যুদ্ধবিমান।
📌 ড্রোন যে প্রক্রিয়ায় কাজ করে তার নাম UAV (Unmanned Aerial Vehicle)। UAV চালাতে রিমোট লাগে।
UAV-তে থাকে ককপিট, স্পাই ক্যামেরা, জিপিএস, সেন্সর, লাইট সেন্সর ইত্যাদি।
📌 ড্রোনের দুটি সিস্টেম থাকে: একটি ড্রোনের নিজের সিস্টেম, আরেকটি কন্ট্রোলার সিস্টেম। কন্ট্রোলার থেকে যে কমান্ড দেওয়া হয়, ড্রোন সেভাবে কাজ করে।
ড্রোনে রাডার পজিশন, Gyro পজিশন সিস্টেম, ফ্লাইজোন, FTP-এর মতো প্রযুক্তি থাকে। এর বড় সুবিধা: মিসাইল ছাড়ার পর ক্রুজ মিসাইলের মতো নিজের গতিপথ বদলাতে পারে।
বোর্ড বই: পৃষ্ঠা ৪৫–৪৯ (অধ্যায় ১: মহাকাশ অভিযান, আইসিটিনির্ভর উৎপাদন, প্রতিরক্ষা)